২৪ অক্টোবর ২০২৬ , ৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ


পরীক্ষামূলক সম্প্রচার

ঢাকা শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬

রেণুবিন্দু থেকে নিয়তির লিখন : মানব সৃষ্টির ঐশী রহস্য

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট | ন্যশনাল টাইমস টোয়েন্টিফোর.কম
আপলোড সময় : ০৯-১০-২০২৫ ০৭:৪১:৩৯ অপরাহ্ন
রেণুবিন্দু থেকে নিয়তির লিখন : মানব সৃষ্টির ঐশী রহস্য

মানব সৃষ্টির সূচনা কোনো কাকতালীয় প্রক্রিয়া নয়; এটি নির্ধারিত পরিকল্পনার এক নিখুঁত ধারাবাহিকতা। মায়ের গর্ভে যে রেণুবিন্দু জমা হয়, সেটিই আল্লাহর নির্দেশে ধীরে ধীরে এক জীবন্ত সত্তায় রূপান্তরিত হয়। নিচের হাদিসটিতে তার চমৎকার একটি ধারাবিবরণী উঠে এসেছে-

 عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ أَسِيدٍ، يَبْلُغُ بِهِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ "‏ يَدْخُلُ الْمَلَكُ عَلَى النُّطْفَةِ بَعْدَ مَا تَسْتَقِرُّ فِي الرَّحِمِ بِأَرْبَعِينَ أَوْ خَمْسَةٍ وَأَرْبَعِينَ لَيْلَةً فَيَقُولُ يَا رَبِّ أَشَقِيٌّ أَوْ سَعِيدٌ فَيُكْتَبَانِ فَيَقُولُ أَىْ رَبِّ أَذَكَرٌ أَوْ أُنْثَى فَيُكْتَبَانِ وَيُكْتَبُ عَمَلُهُ وَأَثَرُهُ وَأَجَلُهُ وَرِزْقُهُ ثُمَّ تُطْوَى الصُّحُفُ فَلاَ يُزَادُ فِيهَا وَلاَ يُنْقَصُ ‏"‏ ‏.‏

হুযাইফাহ্ ইবনু আসিদ (রা.) থেকে মারফু সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, জরায়ুতে চল্লিশ অথবা পঁয়তাল্লিশ দিন রেণু জমা থাকার পর সেখানে ফেরেশতা গমন করে।

 
অতঃপর সে বলতে থাকে, হে আমার প্রভু! সে কি হতভাগ্য না সৌভাগ্যবান? তখন উভয়টাতে লিপিবদ্ধ করা হয়। তারপর সে বলতে থাকে, হে আমার রব! সে কি পুরুষ না মহিলা? তখন আদেশ অনুসারে উভয়টা লিপিবদ্ধ করা হয়। তার আমল, আচরণ, মৃত্যুক্ষণ ও জীবনোপকরণ লিপিবদ্ধ করা হয়। তারপর ফলকটিকে পেঁচিয়ে দেওয়া হয়।
 
তাতে কোনো অতিরিক্ত করা হবে না এবং ঘাটতিও হবে না! (মুসলিম, হাদিস : ২৬৪৪)

 

হাদিসের ব্যাখ্যা

নবী করিম (সা.)-এর এই হাদিস মানবজীবনের প্রথম ধাপকে শুধু জীববৈজ্ঞানিক নয়, আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায়ও পরিণত করেছে। এখানে ফেরেশতার আগমন মানে হলো—মানব অস্তিত্বের সঙ্গে আল্লাহর তদারকির সূচনা।

আল্লাহ বলেন, ‘তিনি তোমাদের সৃষ্টি করেছেন মাটির নির্যাস থেকে, তারপর বীর্যবিন্দু থেকে, তারপর তিনি তোমাদের যুগল বানিয়েছেন। আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে কোনো নারী গর্ভধারণ করে না, সন্তান প্রসবও করে না।

 
’
(সুরা ফাতির : ১১)

 

এই আয়াত ও হাদিস একত্রে প্রমাণ করে যে মানবজীবনের প্রতিটি ধাপ আল্লাহর পরিকল্পনার অংশ, কোনো কিছুই অজ্ঞাতসারে ঘটে না।

ফেরেশতার প্রশ্ন ও লিখন : নিয়তির প্রথম অধ্যায়

হাদিসের ভাষ্য মতে, ফেরেশতা চারটি বিষয়ে লিখে নেয়—
১. সে সৌভাগ্যবান না হতভাগ্য,
২. সে পুরুষ না নারী,
৩. তার আমল বা কর্মপথ,
৪. তার মৃত্যুর সময় ও জীবনোপকরণ।

এই চারটি বিষয়ই মানুষের নিয়তির মূল কাঠামো। ফেরেশতার এই লিখন ‘লাওহে মাহফুজ’-এ সংরক্ষিত চিরন্তন বিধানেরই প্রতিলিপি। অর্থাৎ মানুষের জীবনযাত্রা, জীবিকা, সময়সীমা, এমনকি ভাগ্যের উত্থান-পতনও আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়।

 

ইবনু হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন, ‘ফেরেশতার এই লিখন কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নয়, বরং পূর্বনির্ধারিত বিধান বাস্তবায়নের অংশ।’ (ফাতহুল বারী, ১১/৪৮১)

 

কর্ম ও নিয়তির সম্পর্ক : মানুষের ভূমিকা কোথায়

এখানে কেউ কেউ প্রশ্ন করেন—যেহেতু সব কিছু লেখা হয়ে যায়, তাহলে মানুষের আমলের মূল্য কী?

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, “এই হাদিস মানুষের কর্মকে অকার্যকর করে না; বরং বোঝায় যে, যে যেমন কাজ করবে, আল্লাহ তার জন্য সে পথ সহজ করে দেবেন।’ (শরহে মুসলিম)

অর্থাৎ আল্লাহর লিখন পূর্বনির্ধারিত হলেও তা মানবের পছন্দ-অপছন্দ ও কর্মের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। মানুষ যেমন জীবন বেছে নেয়, তেমনই আল্লাহর বিধান তার জীবনে প্রতিফলিত হয়।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে— ‘যে সৎকর্ম করে, তা নিজের জন্যই করে; আর যে মন্দ করে, তা নিজেরই বিপরীতে করে।’  (সুরা : ফুসসিলাত: ৪৬)

এইভাবেই ইসলামে নিয়তি বা তাকদীর কোনো স্থবির ধারণা নয়; বরং তা আল্লাহর পূর্ণ জ্ঞানের প্রতিফলন, যেখানে মানুষের ইচ্ছা ও পরিশ্রমেরও ভূমিকা আছে।

জীবনের পূর্বলিখিত কাঠামো : অনিশ্চয়তায় নয়, আশায়

মহানবী (সা.)-এর এই হাদিস মানুষকে হতাশ করার জন্য নয়, বরং আশাবাদী করার জন্য। একদিকে এটি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়; তুমি কারো দাস নও, আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে আছ; অন্যদিকে মনে করিয়ে দেয়; তোমার কর্মের মূল্য আছে, তাই পরিশ্রম করো।
রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেকের জন্য সেই কাজ সহজ করে দেওয়া হয়, যার জন্য সে সৃষ্টি হয়েছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৬০৫) অর্থাৎ যে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি, তার জন্য আল্লাহ জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। সৎকাজের প্রতি তার মনোযোগ বাড়িয়ে দেন। আর যে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি, সে নিজেই খারাপ পথে পা বাড়ায়।

আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হাদিসের ব্যাখ্যা

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন— “নুতফাহ (বীর্যরেণু) চল্লিশ বা পঁয়তাল্লিশ দিন থাকে, তারপর ফেরেশতা এসে জিজ্ঞেস করে—হে আমার প্রভু! এটি কী হবে—সৌভাগ্যবান না হতভাগ্য? পুরুষ না নারী ‘ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৪৫)

প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে—যেখানে বিজ্ঞান বলে শিশুর লিঙ্গ নির্ধারিত হয় নিষেকের মুহূর্তে, সেখানে হাদিসে বলা হচ্ছে ৪০-৪৫ দিন পর ফেরেশতার লিখনের কথা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এখানে দুটি ভিন্ন স্তরের সত্য আলোচিত হয়েছে।

বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে জৈবিক প্রক্রিয়া—যখন শুক্রাণুর এক্স বা ওয়াই ক্রোমোজোম ডিম্বাণুর সঙ্গে মিলিত হয়ে লিঙ্গ নির্ধারণ করে।
হাদিস ব্যাখ্যা করে ঐশী প্রশাসন—যখন আল্লাহর আদেশে ফেরেশতা জীবনের গতি, নিয়তি ও আত্মা-সংক্রান্ত নির্দেশ লিপিবদ্ধ করে।

অর্থাৎ বিজ্ঞান বলে ‘কিভাবে’ একটি মানবদেহ গঠিত হয়, আর হাদিস বলে ‘কেন’ ও কার ইচ্ছায় সেই সত্তার নিয়তি নির্ধারিত হয়।
এভাবে দেখা যায়—

•    লিঙ্গ জৈবিকভাবে নির্ধারিত হয় নিষেকের মুহূর্তে,
•    কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে তা অনুমোদিত ও নথিভুক্ত হয় ৪০ দিন পর,

যেমন একটি আইন আগে সিদ্ধান্ত হয়, পরে গেজেটে প্রকাশিত হয়।

সুতরাং হাদিস ও বিজ্ঞান পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একে অন্যের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ করে। বিজ্ঞান দেখে রেণুবিন্দুর ভেতরের কোড, ইসলাম দেখে সেই কোডের পেছনের স্রষ্টার জ্ঞান। এ দুই দৃষ্টিকোণেই ফুটে ওঠে আল্লাহর অসীম প্রজ্ঞা, যিনি বলেন— ‘তিনি সব কিছুকে তাঁর জ্ঞানে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ১২)

রেণুবিন্দু থেকে নিয়তির মহাগল্প

এক ফোঁটা রেণু, এক অনাদৃত বিন্দু থেকে শুরু হয় মানুষের যাত্রা। সেই যাত্রার প্রতিটি ধাপে আল্লাহর লেখা, ফেরেশতার লিপি, আর মানুষের কর্ম একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। জীবন তাই নিছক কাকতালীয় নয়, বরং ঈশ্বরনির্ভর অর্থপূর্ণ একটি যাত্রা।

যেমন পবিত্র কোরআন ঘোষণা করে— ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে, তারপর তাকে ফিরিয়ে দিয়েছি নিকৃষ্টতম স্তরে, তবে তারা ব্যতিক্রম যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে।’ (সুরা : আত-তীন, আয়াত : ৪–৬)

মানুষ তাই তার নিয়তি লিখতে পারে না, কিন্তু নিজের কর্মের মাধ্যমে নিয়তিকে সম্মানিত করতে পারে। গর্ভের ফেরেশতা যখন সেই শিশুর ভবিষ্যৎ লিখে যায়, তখন থেকেই তার দায়িত্ব শুরু হয়—জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে সেই লিখনের মর্যাদা রক্ষা করা।

 
 
 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ